৩৬ হাজার কোটি টাকা ॥ বৃহত্তম ভারতীয় ঋণ

তৃতীয় এলওসি বা নমনীয় চুক্তির আওতায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কাছ থেকে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় ঋণ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ভারতের প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির ঢাকা সফরের সময় এই চুক্তি করা হবে। দেশটির বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য ভারত সরকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতীয় ঋণের অর্থ দিয়ে এই প্রকল্পের কাজ করা হবে। এ জন্য ব্যয় হতে পারে ৮০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য ১৭ প্রকল্পসহ ভারত এবার মোট সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো আগামী ৩ অক্টোবর অরুণ জেটলি তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা আসছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের নবেম্বরে পররাষ্ট্র সচিবের ভারত সফরের সময় তৃতীয় এলওসির (লাইন অব ক্রেডিট) বিষয়ে ভারতের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়। অবকাঠামো, দারিদ্র্য বিমোচন ও দুই দেশের সংযোগে ভূমিকা রাখে এমন প্রকল্প নিতে ভারতের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেয়া হয়। পররাষ্ট্র সচিব সেই সময় দেশে ফিরেই ইআরডিকে চিঠি দিয়ে প্রকল্প বাছাইয়ের অনুরোধ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্প চূড়ান্ত করেছে ইআরডি।

প্রসঙ্গত, ভারতের প্রথম এলওসির ১৫ প্রকল্পের মধ্যে বারোটির কাজ শেষ হয়েছে। গত সাত বছরে এসব প্রকল্পের বিপরীতে ৩৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার ছাড় করেছে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক। প্রথম এলওসির আওতায় ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণ দেয়ার কথা। ওই এলওসির তিনটি প্রকল্পের কাজ এখনও চলমান। প্রথম এলওসির পর এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আরও দুটি এলওসি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় এলওসির ১৪ প্রকল্পের বারোটিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে ভারত। তবে প্রকল্পগুলোর মাঠ পর্যায়ের কাজ এখনও শুরু হয়নি। অন্যদিকে শেষ বা তৃতীয় এলওসির জন্য বাংলাদেশের তরফে ১৭ প্রকল্প বাছাই করা হয়েছে। এসব প্রকল্প যাচাই-বাছাই করতে সম্প্রতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘নেগোসিয়েশন মিটিং’ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।

ওই বৈঠকে যেসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে-রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত অন্য স্থানে নেয়ার অবকাঠামো উন্নয়ন, বুড়িগঙ্গা রিভার রেস্টোরেশন প্রজেক্ট, চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ, পায়রা বন্দরের টার্মিনাল নির্মাণ, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত দ্বৈতগেজ রেলপথ নির্মাণ, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নত করা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বেনাপোল পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা, চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের বারইয়ারহাট থেকে খাগড়াছড়ির রামগড় পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, মীরসরাইয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে এক লাখ এলইডি বাল্ব সরবরাহ, ঈশ্বরদীতে রেল ও সড়ক পথের জন্য আইসিডি নির্মাণ, মংলায় ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুত প্রকল্প, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তরল বর্জ্য শোধনাগারের যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর হয়ে সরাইল পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণ প্রকল্প।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে এলওসির মাধ্যমে ঋণ দিতে শুরু করে ভারত। প্রথমে ১০০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি হয়। পরে ওই ঋণের ২০ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে দেয় ভারত। ২০১৫ সালের দ্বিতীয় এলওসিতে ঋণচুক্তি হয় ২০০ কোটি ডলারের। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের সময় ৫০০ কোটি ডলারের তৃতীয় এলওসির ঘোষণা দেয় ভারত। প্রথম দুটি এলওসির ২৯ প্রকল্পের মধ্যে বাস, ট্রাক, ট্রেনের ইঞ্জিন, বগি, ড্রেজারসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি কেনার প্রকল্পই বেশি। এ ছাড়া রেলসেতু ও রেললাইন নির্মাণ সংক্রান্ত কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে। তৃতীয় এলওসিতে বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বেশি।

এ প্রসঙ্গে ইআরডির অতিরিক্ত সচিব শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, তৃতীয় এলওসি চুক্তির মাধ্যমে ভারত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। এবার ভারতের সিদ্ধান্ত পেলেই হবে। তিনি বলেন, কমিটমেন্ট ফি বাতিলের দাবিসহ তৃতীয় এলওসির কিছু অংশ অনুদান ঘোষণার দাবি আসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে। সেটিও তারা নোট আকারে নিয়েছেন। সব কিছুই চূড়ান্ত হবে চুক্তির মাধ্যমে।

জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আমন্ত্রণেই ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি তিন দিনের সফরে ৩ অক্টোবর ঢাকায় আসছেন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ভারতের অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত দুটি সেমিনারেও বক্তব্য রাখবেন তিনি। চলতি বছরের শুরু থেকেই অরুণ জেটলির সফর নিয়ে ঢাকা ও দিল্লীর মধ্যে আলোচনা চলছিল। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দুই দফা তার ঢাকা সফরের তারিখ প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু উভয় পক্ষের সুবিধাজনক না হওয়ায় সেই সময়ে সফরটি বাস্তবায়িত হয়নি। এবার উভয় পক্ষের সুবিধাজনক তারিখেই আবার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লী সফরে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, যোগাযোগ-কানেক্টিভিটি ও উন্নয়ন খাতে ৩৫ দফা যৌথ ঘোষণা সই হয়।

এ ছাড়া গত ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরের সময় বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ভারত সরকার। ওই বছরের ৭ আগস্ট ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে ২০ কোটি ডলার অনুদান হিসেবেও ঘোষণা করে ভারত। এই অনুদান ব্যবহার করা হয় পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে। প্রথমদিকে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তি অনুযায়ী ৮৫ শতাংশ পণ্য ভারত থেকে এবং ১৫ শতাংশ পণ্য ভারতীয় ঠিকাদারের পরামর্শে বাংলাদেশ থেকে কেনার মতো কঠিন শর্ত ছিল, যা পরে শিথিল ও নমনীয় করা হয়।

584 total views, 6 views today

Leave a Reply

সর্বশেষ সংবাদ