প্রধান বিচারপতি হলেন সৈয়দ মাহমুদ

আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন নতুন প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে তার নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এ প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। ওয়াহ্হাব মিয়ার জমাদার কামাল হোসেনসহ দুইজন বঙ্গভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে একটি রিসিভ কপি নিয়ে আসেন। ওই পত্রে ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগের কথা লিখেছেন বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা।

তিনি লিখেছেন, ‘আমার অনিবার্য ব্যক্তিগত কারণ বশত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকের পদ হইতে এতদ্বারা পদত্যাগ করিলাম।’ এ ছাড়া এদিন দুপুর ১২টার আগেই ব্যক্তিগত সব ফাইলপত্র নিজ খাসকামরা থেকে সরিয়ে বাসায় নিয়ে যান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি লিখেছেন, ‘আমার অনিবার্য ব্যক্তিগত কারণ বশত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকের পদ হইতে এতদ্বারা পদত্যাগ করিলাম।’ এ ছাড়া এদিন দুপুর ১২টার আগেই ব্যক্তিগত সব ফাইলপত্র নিজ খাসকামরা থেকে সরিয়ে বাসায় নিয়ে যান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

গত ২ জানুয়ারি দৈনিক আমাদের সময় ‘প্রধান বিচারপতি হচ্ছেন সৈয়দ মাহমুদ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শুক্রবার বেলা সোয়া ২টায় রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির নিয়োগসংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেন। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের কিছুক্ষণ পরই আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক মাননীয় বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেছেন। শপথ গ্রহণের দিন থেকে তার নিয়োগ কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে।আজ শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে তিনি শপথ নেবেন। শপথ নেওয়ার তথ্যটি আমাদের সময়কে নিশ্চিত করেন সুপ্রিমকোর্টের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. জাকির হোসেন। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে ডিঙিয়ে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের খবর বৃহস্পতিবার রাত থেকেই গণমাধ্যমে চলে আসে।  এ কারণে শুক্রবার দুপুর ১২টার আগেই তিনি সুপ্রিমকোর্টে গিয়ে তার ব্যক্তিগত ফাইলসহ কিছু জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন। এ ছাড়া মনোক্ষুণœ হয়ে গতকাল বিকালে বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। অবশ্য তার পদত্যাগের ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃপক্ষ কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের আগে তার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করতে পারেন না। কারণ নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের আগেই তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হলে দেশে কোনো প্রধান বিচারপতিই থাকে না, যেটি একটি অস্বাভাবিক বিষয়। এ কারণে আজ শনিবার সন্ধ্যায় বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের শপথগ্রহণের পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা মুখ খুলতে পারেন।বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা আওয়ামী লীগ আমলে ১৯৯৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। দুই বছর পর তার নিয়োগ স্থায়ী হয়। ২০১১ সালে আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলে আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মতে রায় এসেছিল; ওই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে মত জানিয়েছিলেন বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা। যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের সময় একমাত্র বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞার দ্বিমত ছিল। এ ছাড়া জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে খালাস দেওয়ার পক্ষে রায় দেন তিনি। আগামী ১০ নভেম্বর তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘ প্রায় চার মাস ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ না পেয়েই মূলত গতকাল তিনি পদত্যাগ করেন।গতকাল সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতেই গণভবনে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তারা রাতেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বসে প্রধান বিচারপতি হিসেবে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে নির্ধারণ করেন। এ খবর পেয়ে সকাল থেকেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা পদত্যাগের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।তবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, আমি খুব খুশি। স্বস্তিবোধ করছি। অপেক্ষার অবসান হলো। এখন সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। শনিবার নতুন প্রধান বিচারপতির শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেব। এ ছাড়া রবিবার অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতির এজলাসে নতুন প্রধান বিচারপতিকে অভিনন্দন জানাব। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ব্যাপারে তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যে কাউকেই নিয়োগ দিতে পারেন।
উল্লেখ্য, সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ ‘প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং প্রধান বিচারপতির সহিত পরামর্শ করিয়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগদান করিবেন।’ এ কারণে রাষ্ট্রপতি যোগ্য যে কাউকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির পদটি দীর্ঘদিন খালি ছিল, এটি পূরণ হলো।’ জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এটি তো রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে দুটি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছেÑ একটি প্রধানমন্ত্রী ও অন্যটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। রাষ্ট্রপতি তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা দ্বারা প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করবেন। সংবিধানে তো বলা নেই, যিনি জ্যেষ্ঠ তাকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে।’
জানতে চাইলে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘অতীতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে একাধিকবার প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হয়েছে। তাই এটি খুব বেশি ব্যতিক্রমী নয়। নতুন প্রধান বিচারপতিকে অভিনন্দন। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা যে পদত্যাগ করেছেন, তার জন্য তাকে আরও বেশি অভিনন্দন। কারণ নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি যে অবস্থান নিয়েছেন, সেটি বড় বেশি দরকার ছিল।’উল্লেখ্য, গত বছর ১০ নভেম্বর ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সিঙ্গাপুর থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান। এর আগে ১ আগস্ট উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নিয়ে করা ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশ করা হয়। এই রায়ে প্রধান বিচারপতির দেওয়া বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন মন্ত্রী, দলীয় নেতা ও সরকারপন্থি আইনজীবীরা। তারা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিও তোলেন। সমালোচনার মধ্যেই ১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা হঠাৎ করেই এক মাসের ছুটির কথা জানিয়ে চিঠি দেন। পরের দিন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্্হাব মিঞাকে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়।৯৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রধান বিচারপতি তাহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমতো অন্য কোনো ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।’ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর আইনমন্ত্রী জানান, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ক্যানসারে আক্রান্ত। এ কারণ উল্লেখ করে তিনি ছুটির আবেদন জানিয়েছেন। পরে ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন প্রধান বিচারপতি। দেশ ছাড়ার আগে প্রধান বিচারপতি তার বাসভবনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। বিচার বিভাগের স্বার্থে আবার ফিরে আসব। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে একটি মহল প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছেন।’ তিনি একটি লিখিত বিবৃতিও সাংবাদিকদের দিয়ে যান। পরের দিন ১৪ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসতে চাননি আপিল বিভাগের বিচারপতিরা। এর পর ছুটি শেষ হওয়ার আগে বিচারপতি এসকে সিনহা অস্ট্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে আসেন। সেখানে উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে দফায় দফায় সমঝোতা বৈঠক করেন। বৈঠকে বিচারপতি এসকে সিনহা ১১ অভিযোগের বিষয়টি নিষ্পত্তি করে সম্মানজনকভাবে দেশে ফিরে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য এজলাসে বসতে চেয়েছিলেন। অন্যথায় পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা না হওয়ায় ১০ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে বসেই পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে বিচারপতি সিনহা কানাডায় চলে যান। পরের দিন পদত্যাগপত্রটি রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পৌঁছে। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ওই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। এর পর থেকেই প্রধান বিচারপতির পদটি শূন্য ছিল।

3,453,764 total views, 9 views today

সর্বশেষ সংবাদ