মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ২০

বসন্ত এসে গেছে

‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’। পহেলা ফাল্গুন আজ। প্রকৃতিতেও বিরাজ করছে ফাল্গুনের আবহ। ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করা বাঙালির ঐতিহ্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় বসন্তবরণে ফাল্গুন মাসে বেশ কিছু লোকজ উৎসব পালিত হতো। এর অন্যতম হলো দোলযাত্রা বা বসন্ত উৎসব। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে হতো দোলযাত্রা। এর পেছনে রয়েছে বৃন্দাবনে রাধা-কৃষ্ণের ও গোপীদের আবিরখেলার পৌরাণিক কাহিনি। বৈষ্ণব ধর্মমতে, এই তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে তার সাথিদের নিয়ে রঙ খেলায় মেতেছিলেন। দোল ও বসন্তবরণ উপলক্ষে মেলা বসত গ্রামেগঞ্জে। বাংলার বাইরে অবিভক্ত ভারতের অন্যান্য স্থানে এটি হোলি উৎসব নামে প্রচলিত ছিল। এখনো ভারতে বাংলার বাইরে হোলি এবং বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে দোল উৎসব হয়ে থাকে। বসন্তকালে রাসমেলা বা রাসযাত্রারও প্রচলন হয় মধ্যযুগে। নবদ্বীপ থেকেই রাসমেলার উৎপত্তি। এটিও মূলত বসন্তকালেই হয়ে থাকে। বাংলাদেশের খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রাসমেলা হয়ে থাকে। রাসমেলায় কীর্তনগানের আসর, নৃত্য ইত্যাদির আয়োজন থাকে। এ ছাড়া গ্রামে গ্রামে শীতলাদেবী বা বসন্তদেবীর পূজার রেওয়াজ ছিল প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচার অনুপ্রেরণায়। শীতলা বা বসন্তদেবী ছিলেন বাংলার লোকজ দেবী।প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় বসন্তবরণের আরেকটি অনুষ্ঠান ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ফাল্গুনী পূর্ণিমা উদযাপন। মধ্যযুগে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসেবে আকবরি সন বা ফসলি সনের প্রবর্তন করেন। সে সময় ১৪টি উৎসব পালনের রীতিও প্রবর্তিত হয়। এর অন্যতম ছিল বসন্ত উৎসব। সে সময় বাংলার সব সম্প্রদায়ের মানুষই বসন্তবরণে বিভিন্ন লোকজ উৎসব ও মেলায় অংশ নিতেন।

আধুনিককালে ধর্মনিরপেক্ষ বসন্ত উৎসবের প্রচলন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইংরেজ শাসনামলে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। এর পুনরুদ্ধারে ১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ব্যতিরেকে সব সম্প্রদায়ের পক্ষে পালনীয় বসন্ত উৎসব শুরু করেন। বর্তমানে বসন্ত উৎসব শান্তিনিকেতনের একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এই উৎসবে রঙখেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজন থাকে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি একের পর এক আঘাত আসতে থাকে। এর প্রতিবাদে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির জাগরণ শুরু হয়। ষাটের দশকে বসন্ত উৎসব পালন শুরু হয় ঢাকায়। এ উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বাসন্তী রঙের পোশাক পরার বিশেষ রীতি প্রচলিত হয়। বাংলাদেশে নতুনভাবে বসন্তবরণ উৎসব শুরু হয় নব্বই দশকে। ১৪০১ বঙ্গাব্দ (১৯৯৪ সাল) থেকে চারুকলায় বসন্তবরণ শুরু হয়। জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ এই দিনকে বরণ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় এবং ধানম-ির রবীন্দ্র সরোবর উন্মুক্ত মঞ্চে প্রতিবছর বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে থাকে।বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বসন্তবরণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রকম লোকজ উৎসব অনুষ্ঠানের প্রথা রয়েছে। চীনের বসন্ত উৎসব বিখ্যাত। গ্রেকো-রোমান, বৈদিক, প্রাচীন মিসরীয়সহ বিভিন্ন পুরাণে বসন্তসম্পর্কীয় কাহিনি রয়েছে। মূলত সব দেশের বসন্তবরণ উৎসবের মূল প্রেরণা হলো শীতের পর নতুন জীবনের উন্মেষকে বরণ করে নেওয়া। বসন্তবরণ উপলক্ষে আজ ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। বাসন্তী পোশাক ও ফুলের গয়না পরা তরুণ-তরুণী ও শিশু-কিশোরের পদচারণায় মুখর হচ্ছে বইমেলা ও শাহবাগ।

346,572 total views, 4 views today

সর্বশেষ সংবাদ