বরিশালে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় ডিবি’র ৮ সদস্য সাসপেন্ড, উপ-কমিশনারকে অব্যাহতি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজ এর ক্যামেরা পার্সন সুমন হাসানকে নির্যাতনের ঘটনায় প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন ডিবি পুলিশের উপ কমিশনার উত্তম কুমার পালকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়াও এই ঘটনার সাথে জড়িত ডিবি পুলিশের আরো ৫ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর আগে সুমন হাসানকে নির্যাতনকারী ওই ডিবি পুলিশের টিমের ৩ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়। এই নিয়ে নির্যাতনকারী ডিবি পুলিশের ওই টিমের সকল সদস্যকেই বরখাস্ত করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। সোমবার সন্ধ্যায় বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। পুরো বিষয়টি নিয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং সাংবাদিকদের সাথে বিরোধে সৃষ্টি হয়। ঘটনার প্রতিবাদে মাঠে নামে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন। সাংবাদিক নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঘরে না ফেরার ঘোষণা দেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। কার্যত সাংবাদিক ও মেট্রো পুলিশের মধ্যকার এ বৈঠকের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির হোসেন। এর আগে গত পরশু মেট্রোপলিটন পুলিশ অফিসার্স ক্লাব মিলনায়তনে দু’পক্ষের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নেতৃবৃন্দ ঘটনার বর্ণনা এবং এঘটনায় জড়িত ৮জনের প্রত্যেকের বরখাস্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়ে আসেন। পরে গতকাল বিকেলে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের সাথে বিএমপি কমিশনারের কনফারেন্স কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গতকাল পুলিশের পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক বিবৃতি আসে। গতকাল বিকেলে বক্তব্য দেয়ার সময় বিএমপি কমিশনার এসএম রুহুল আমিন পুলিশের গৃহিত ব্যবস্থাগুলোর বর্ণনা দেন। এসময় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে সিনিয়র সাংবাদিক মুরাদ আহমেদ, হুমায়ুন কবির, আখতার ফারুক শাহীন, শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির হোসেন, দৈনিক পরিবর্তনের সম্পাদক কাজী মিরাজ মাহমুদ, বিআরইউ’র সভাপতি নজরুল বিশ্বাস, মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী আজাদ, বিঞ্জা সভাপতি ফেরদৌস সোহাগ, নিউজ টুয়েন্টি ফোর চ্যানেলের বরিশাল ব্যুরো চীফ রাহাত খান, ডিবিসি নিউজের বরিশাল প্রতিনিধি অপূর্ব অপু বক্তৃতা করেন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্যে সাংবাদিক নির্যাতনের পরবর্তীতে পুলিশ কমিশনারের গৃহিত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন ভবিষ্যতে চলারপথে এমন অঘটন যেন আর না ঘটে। জবাবে পুলিশ কমিশনার এস.এম রুহুল আমিন বলেন, পুরো ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পর যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে ঘটমান বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ তদন্ত প্রতিবেদনে ১৮ জনের সাক্ষ্য বর্ণনা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন ভবিষ্যতেও বরিশালের সাংবাদিক-পুলিশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে। এই ঘটনায় সাময়িক বরখাস্তরা হল- সুমন হাসানকে নির্যাতনকারী ডিবি পুলিশের ওই টিমের প্রধান এসআই আবুল বাশার, এএসআই মো: আক্তারুজ্জামান, স্বপন চন্দ্র দে, কনস্টেবল মাসুদুল হক, মো: আব্দুর রহিম, চৌধুরী রাসেল পারভেজ, মো: হাসান মাহামুদ ও কাজী সাইফুল ইসলাম। এদের মধ্যে ১৩ই মার্চ দুপুরে ঘটনার পর পরই প্রাথমিক তদন্তে দোষী প্রমানিত হওয়ায় ১৪ই মার্চ সাময়িক ভাবে বরখাস্ত হয় প্রধান নির্যাতনকারী পুলিশ কনস্টেবল মাসুদুল হক। এর পরে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৫ই মার্চ আরো দুইজন অর্থাৎ আব্দুর রহিম ও চৌধুরী রাসেল পারভেজকে বরখাস্তের আদেশ দেয়া হয়। সর্বশেষ গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে এবং পুলিশ হেড কোয়াটার্স এর নির্দেশনা অনুযায়ী ১৮ই মার্চ রাতে সাংবাদিক নির্যাতনকারী ডিবি পুলিশের ওই টিমের নেতৃত্ব দেয়া এসআই আবুল বাশার এবং এএসআই আক্তার এবং স্বপন সহ ৫ জনকে সাময়িক ভাবে বরখাস্তের আদেশ দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমিন। ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সুমনকে নির্যাতনকারী ডিবি পুলিশের টিমের ওই আট সদস্যকে বহিস্কারের পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককে আলাদা ভাবে কারন দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব পাওয়ার পরে স্ব স্ব অপরাধ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনার উত্তম কুমার পালকে তার অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সদ্য যোগদানকারী উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন ভূঁঞাকে ডিবি’র উপ কমিশনার পদে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এসএম রুহুল আমিন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি প্রথমেই দুঃখ প্রকাশ করেছি। এই ঘটনার সাথে জড়িতদের সঠিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে সকল সদস্যকেই। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হচ্ছে।’ প্রসঙ্গত: ১৩ই মার্চ দুপুরে বরিশাল নগরীর দক্ষিণ চকবাজার এলাকার বিউটি রোডে মাদক সংক্রান্ত অভিযানের তথ্য জানতে গেলে ডিবি পুলিশের এসআই আবুল বাশারের টিমের ৮ পুলিশ সদস্য ডিবিসি নিউজের ক্যামেরা পার্সন সুমন হাসানকে বেধড়ক মারধর করে। পরে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। খবর পেয়ে সুমন হাসানের সহকর্মীরা ডিবি কার্যালয়ে গেলে সেখানেও পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সামনে বসেও টেলিভিশন চ্যানেলের কয়েকজন সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করা হয়। উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে তর্ক বিতর্কের পর সাংবাদিকরা সুমন হাসানকে গুরুত্বর আহত ও অসুস্থ্য অবস্থায় বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। এখনো সে চিকিৎসাধীণ রয়েছেন ওই হাসপাতালে। এই ঘটনার পরপরই সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে এই অমানবিক নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করা হয়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সৃষ্টি হয় সমালোচনার ঝড়।

83 total views, 4 views today

সর্বশেষ সংবাদ